কোনো নির্দিষ্ট দীর্ঘ রচনাকে সহজবোধ্য করে এর বিষয়বস্তু লেখা বা পরিবেশন করাকে সারাংশ বলে। সারাংশ লেখার জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সেগুলো অবশ্যই মানতে হবে। প্রথমেই অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে মূল রচনাটি পড়তে হবে। একবার পড়ে বক্তব্য স্পষ্ট না হলে একাধিকবার পড়তে হবে। লেখার সময় অবশ্য মনে রাখতে হবে যে, কোনো অপ্রয়োজনীয় কিছু লেখা যাবে না। বক্তব্য যত সহজে বলা যায় ততই ভালো। মূলে কোনো দৃষ্টান্ত, কোনোকিছুর সঙ্গে তুলনা করে কোনো উদাহরণ দেওয়া থাকলে তা বাদ দিতে হবে। সারাংশ সবসময়ই মূলের থেকে ছোট হবে।
এক
ভাত বাঙালির বহুকালের প্রিয় খাদ্য। এ অঞ্চলের সরু সাদা চালের গরম ভাতের কদর সবচাইতে বেশি ছিল বলে মনে হয়। পুরোনো সাহিত্যে ভালো খাবারের নমুনা হিসেবে যে-তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা হলো কলার পাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, নালিতা শাক, মৌরলা মাছ আর খানিকটা দুধ। লাউ, বেগুন ইত্যাদি তরকারি প্রচুর খেত সেকালের বাঙালিরা, কিন্তু ডাল তখনো বোধহয় খেতে শুরু করেনি। মাছ তো প্রিয় বস্তুই ছিল। বিশেষ করে ইলিশ মাছ। শুঁটকির চল সেকালেও ছিল বিশেষ, করে দক্ষিণাঞ্চলে। ছাগলের মাংস সবাই খেত। হরিণের মাংস বিয়েবাড়িতে বা এরকম উৎসবে দেখা যেত। পাখির মাংসও তা-ই। সমাজের কিছু লোক শামুক খেত। ক্ষীর, দই, পায়েস, ছানা- এসব ছিল বাঙালির নিত্যপ্রিয়। আম-কাঁঠাল, তাল-নারকেল ছিল প্রিয় ফল। খুব চল ছিল নাড়ু, পিঠেপুলি, বাতাসা, কদমা- এসবের। মসলা-দেওয়া পান খেতে সকলে ভালোবাসত।
সারাংশ: বাঙালি জাতির জীবনযাত্রার খাদ্যাভ্যাস অন্যতম। প্রাচীনকাল থেকে এদেশের মানুষ বিচিত্র ধরনের সাধারণ খাবার খেত। উৎসব বা বিয়েতে হরিণের মাংস পরিবেশন করা হতো। সমাজের সকল স্তরের ও অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস প্রায় একই ধরনের ছিল।
দুই
মা-মরা মেয়ে মিনু। বাবা জন্মের আগেই মারা গেছে। সে মানুষ হচ্ছে এক দূরসম্পর্কের পিসিমার বাড়িতে। বয়স মাত্র দশ, কিন্তু এ-বয়সেই সব রকম কাজ করতে পারে সে। লোকে অবশ্য বলে যোগেন বসাক মহৎ লোক বলেই অনাথা বোবা মেয়েটাকে আশ্রয় দিয়েছেন। মহৎ হয়ে সুবিধাই হয়েছে যোগেন বসাকের। পেটভাতায় এমন সর্বগুণান্বিতা চব্বিশ ঘণ্টার চাকরানি পাওয়া শক্ত হতো তাঁর পক্ষে। বোবা হওয়াতে আরও সুবিধা হয়েছে, নীরবে কাজ করে। মিনু শুধু বোবা নয়, কালাও। অনেক চেঁচিয়ে বললে, তবে শুনতে পায়। সব কথা শোনার দরকার হয় না তার। ঠোঁটনাড়া আর মুখের ভাব দেখে সব বুঝতে পারে। এ ছাড়া তার আর-একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে যার সাহায্যে সে এমন সব জিনিস বুঝতে পারে, এমন সব জিনিস মনে-মনে সৃষ্টি করে, সাধারণত বুদ্ধিতে যার মানে হয় না। মিনুর জগৎ চোখের জগৎ, দৃষ্টির ভেতর দিয়েই সৃষ্টিকে গ্রহণ করেছে সে।
সারাংশ: সমাজ বিচিত্র মানুষের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। কেউ সর্বাঙ্গে সুস্থ, কেউ-বা সম্পূর্ণভাবে সুস্থ নয়। বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী হয়ে ছোট্ট মেয়ে মিনু দুঃখ কষ্টে জর্জরিত। তারপরও জীবনকে তুচ্ছ মনে না করে সে কর্মের মধ্য দিয়ে নিজের জগৎ সৃষ্টি করে নিয়েছে।
তিন
আগেকার দিনে লোকে ভাবত, আকাশটা বুঝি পৃথিবীর উপর একটাকিছু কঠিন ঢাকনা। কখনো তারা ভাবত, আকাশটা পরতে পরতে ভাগ করা।
আজ আমরা জানি, আকাশের নীল চাঁদোয়াটা সত্যি সত্যি কঠিন কোনো জিনিসের তৈরি নয়। আসলে এ নিতান্তই গ্যাস-ভর্তি ফাঁকা জায়গা। হরহামেশা আমরা যে আকাশ দেখি তা হলো আসলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ঢাকনা। সেই বায়ুমণ্ডলে রয়েছে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড-এমনি গোটা কুড়িটি বর্ণহীন গ্যাসের মিশেল। আর আছে পানির বাষ্প ধুলোর কণা।
সারাংশ: আকাশকে একসময় মানুষের মাথার উপর ঢাকনা মনে করা হতো। আসলে তা ঢাকনা নয়, রং বায়ুর বিপুল স্তর। এখানে প্রায় বিশটি বর্ণহীন গ্যাস ও পানির বাষ্প আর ধুলোর কণা মিশে আছে ।
চার
আগেকার দিনে আমাদের আকাশ নিয়ে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন শূন্যে বেলুন পাঠিয়ে বা যন্ত্রপাতিসুদ্ধ রকেট পাঠিয়ে। আজ মানুষ নিজেই মহাকাশযানে চেপে সফর করছে পৃথিবীর উপরে বহু দূর পর্যন্ত। পৃথিবী ছাড়িয়ে তারা যেতে পেরেছে চাঁদে। পৃথিবীর উপর দেড়শো দুশো মাইল বা তারও অনেক বেশি উপর দিয়ে ঘুরছে অসংখ্য মহাকাশযান। যেখান দিয়ে ঘুরছে সেখানে হাওয়া নেই বললেই চলে।
মহাকাশযান থেকে দিনরাত তোলা হচ্ছে পৃথিবীর ছবি। জানা যাচ্ছে কোথায় কখন আবহাওয়া কেমন হবে, কোন দেশে কেমন ফসল হচ্ছে। মহাকাশযান থেকে ঠিকরে দেওয়া হচ্ছে টেলিফোন আর টেলিভিশনের সংকেত। এজন্য দূরদেশের সঙ্গে যোগাযোগ আজ অনেক সহজ হয়ে উঠেছে।
সারাংশ: বর্তমানে বেলুনের পরিবর্তে মহাকাশযান পাঠিয়ে আকাশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আর এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে। টেলিভিশন, ফোন, সেলফোন, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট ইত্যাদির মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে সংকেত।
প্রদত্ত পাঠের সংক্ষিপ্ত মর্ম তথা সার উল্লেখ করাকে সারমর্ম বলা হয়। ইংরেজি Substance-এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে সারমর্ম শব্দটি ব্যবহৃত হয়। একে মর্মসত্য বা মর্মার্থ বলা হয়। সারাংশ লেখার ক্ষেত্রে সহজভাবে আসল বক্তব্য অনুধাবন করে লিখতে হয়। সারমর্ম লেখার জন্য মূল রচনার মধ্য দিয়ে কী বলা হয়েছে, তা সংক্ষেপে নিজের ভাষায় উপস্থাপন করতে হয়। আমরা মনে রাখব, সারাংশ বিষয়সংক্ষেপ আর সারমর্ম বিষয়ের অন্তর্নিহিত বক্তব্য। সারমর্ম যেহেতু বিষয়ের অন্তর্নিহিত বক্তব্য, তাই তা প্রদত্ত বিষয়ের চেয়ে আকারে ছোট করে লিখতে হয়।
এক
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে
সার্থক জনম মা গো, তোমায় ভালোবেসে।।
জানি নে তোর ধনরতন
আছে কি না রানির মতন,
শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে॥
কোন বনেতে জানি নে ফুল
গন্ধে এমন করে আকুল,
কোন গগনে ওঠে রে চাঁদ এমন হাসি হেসে।।
আঁখি মেলে তোমার আলো
প্রথম আমার চোখ জুড়ালো
ওই আলোতে নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে।
সারমর্ম: ধনরত্নে পূর্ণ না থাকলেও মাতৃভূমি প্রতিটি মানুষের কাছেই প্রিয়। স্বদেশ পূর্ণতা দেয়, আর এজন্য মানুষ শেষ আশ্রয়টুকু দেশের মাটিতেই চায়।
দুই
পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণেও সুখ;
'সুখ' 'সুখ' করি কেঁদ না আর,
যতই কাঁদিবে, যতই ভাবিবে
ততই বাড়িবে হৃদয় ভার।
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী 'পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।
সারমর্ম: ত্যাগের মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত সুখ। অন্যকে বাদ দিয়ে কেউ একা চলতে পারে না। সুখী হতে পারে না। সব মানুষেরই দায়িত্ব অন্যের আনন্দ-বেদনাকে নিজের বলে গ্রহণ করা। এভাবেই সমাজে সকল মানুষ সুখী হতে পারে।
তিন
জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে
সে জাতির নাম মানুষ জাতি;
এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত
একই রবি শশী মোদের সাথি।
শীতাতপ ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালা
সবাই আমরা সমান বুঝি,
কচি কাঁচাগুলো ডাঁটো করে তুলি
বাঁচিবার তরে সমান যুঝি।
দোসর খুঁজি ও বাসর বাঁধি গো,
জলে ডুবি, বাঁচি পাইলে ডাঙা,
কালো আর ধলো বাহিরে কেবল
ভিতরে সবারই সমান রাঙা।
সারমর্ম: জাতি, ধর্ম, গাত্রবর্ণে পার্থক্য থাকলেও এসকল পরিচয়ের ঊর্ধ্বে হচ্ছে মানুষ জাতি। সব মানুষের অনুভূতিই সমান। মানুষে-মানুষে পার্থক্য করা তাই অন্যায়। সকলের অনুভূতিকে মূল্য দিয়ে একসঙ্গে জীবনযাপন করলেই পৃথিবী সুন্দর হবে।
সারাংশ লেখ:
১. সাজসজ্জার দিকে বেশ ঝোঁক ছিল প্রাচীন বাঙালির। চুলের বাহার ছিল দেখবার মতো। মাথার উপরে চুড়ো করে বাঁধত চুল। এখন মেয়েরা যেমন ফিতে বাঁধে চুলে, তখন শৌখিন পুরুষেরা অনেকটা তেমনি করে কোঁকড়া চুল কপালের উপর বেঁধে রাখত। মেয়েরা নিচু করে 'খোঁপা' বাঁধত নয়তো উঁচু করে বাঁধত 'ঘোড়াচূড়'। কপালে টিপ দিত, পায়ে আলতা, চোখে কাজল আর খোঁপায় ফুল। নানারকম প্রসাধনীও ব্যবহার করত তারা।
মেয়েরা তো বটেই, ছেলেরাও সে-যুগে অলংকার ব্যবহার করত। সোনার অলংকার পরতে পেত শুধু বড়লোকেরা। তাদের বাড়ির ছেলেরা সুবর্ণকুণ্ডল পরত, মেয়েরা কানে দিত সোনার 'তারঙ্গ'। হাতে, বাহুতে, গলায়, মাথায় সর্বত্রই সোনামণিমুক্তো শোভা অভিজাত তাদের মেয়েদের। সাধারণ পরিবারের মেয়েরা হাতে পরত শাঁখা, কানে কচি কলাপাতার মাকড়ি, গলায় ফুলের মালা।
২. আকাশ যদি বর্ণহীন গ্যাসের মিশেল, তবে তা নীল দেখায় কেন? মাঝে মাঝে সাদা আর লাল রঙের খেলাই-বা দেখি কী করে? আসলে সাদা মেঘে জলীয় বাষ্প জমে তৈরি হয় অতি ছোট ছোট অসংখ্য পানির কণা। কখনো মেঘে এসব কণার গায়ে বাষ্প জমার ফলে তা ভারী হয়ে বড় পানির কণা তৈরি হয়। তখন সূর্যের আলো তার ভেতর দিয়ে আসতে পারে না, আর তাই সে-মেঘের রং হয় কালো। কিন্তু সারাটা আকাশ সচরাচর নীল রঙের হয় কী করে, আকাশ নীল দেখায় বায়ুমণ্ডলে নানা গ্যাসের অণু ছড়িয়ে আছে বলে। এইসব গ্যাসের কণা খুব ছোট মাপের আলোর ঢেউ সহজে ঠিকরে ছিটিয়ে দিতে পারে। এই ছোট মাপের আলোর ঢেউগুলোই আমরা দেখি নীল রং হিসেবে। অর্থাৎ পৃথিবীর উপর হাওয়ার স্তর আছে বলেই পৃথিবীতে আকাশকে নীল দেখায়।
সারমর্ম লেখ:
২
শ্যামলী মায়ের কোলে সোনামুখ খুকু রে,
আলুথালু ঘুমু যাও রোদে গলা দুপুরে।
প্রজাপতি ডেকে যায়-
'বোঁটা ছিঁড়ে চলে আয়!'
আসমানে তারা চায়-
‘চলে আয় এ অকূল!’
ঝিঙে ফুল ॥
তুমি বলো- 'আমি হায়
ভালোবাসি মাটি-মা'য়,
চাই না ও অলকায়-
ভালো এই পথ-ভুল!'
ঝিঙে ফুল ॥
Read more